বরকামতায় ১৩০০ বছর ধরে পূজা
দেবিদ্ধারে প্রাচীনতম দুর্গাপূজার অনন্য নিদর্শন।।মমিনুল ইসলাম মোল্লা
বাংলাদেশের কুমিল্লা জেলার দেবিদ্বার উপজেলার বরকামতা দুর্গাবাড়ি শুধু একটি ধর্মীয় উপাসনালয় নয়, এটি একটি ইতিহাস ও ঐতিহ্যের ধারক। প্রায় ১৩০০ বছর ধরে এখানে দুর্গাদেবীর পূজা হয়ে আসছে, যা বাংলাদেশের মধ্যে অন্যতম প্রাচীন দুর্গাপূজা হিসেবে স্বীকৃত। সাধারণত দেশে দুর্গাপূজা শেষে প্রতিমা বিসর্জন দেওয়া হয়, কিন্তু বরকামতা দুর্গাবাড়িতে সেই প্রথা নেই। এ বিশেষত্বই এই মন্দিরকে অন্য সব দুর্গাপূজা কেন্দ্র থেকে আলাদা করে তুলেছে।
ঐতিহাসিক দলিলপত্রে জানা যায়, বরকামতা একসময় সমতটের রাজধানী ছিল। বৌদ্ধ নৃপতি দেব খড়গের মহিষী বরকামতা একসময় সমতটের রাজধানী ছিল। বৌদ্ধ নৃপতি দেব খড়গের মহিষী প্রভাবতী দেবী দুর্গাকে “শর্বাণী” নামে পূজা করতেন। এখানকার বৌদ্ধ খড়গ রাজবংশ (৬২৫-৭২৫ খ্রিস্টাব্দ) সম্বন্ধে কুমিল্লার আশ্রাফপুরের তাম্রশাসন ও প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন আমাদের তথ্য দেয়। বরকামতার চারপাশে এখনো নানা প্রত্নস্মৃতি পাওয়া যায়—২৫ ফুট উঁচু ঢিবির উপর শিবলিঙ্গ, শুভপুরে বজ্রপাণি বোধিসত্ত্বের মূর্তি, পিহর গ্রামে মহাযানী দেবী মরীচির মূর্তি—যা এর প্রাচীনতা ও ধর্মীয় বৈচিত্র্যের প্রমাণ বহন করে।
দুর্গাদেবী হিন্দু ধর্মে শক্তির প্রতীক। তাঁর দশ হাতে দশটি অস্ত্রের প্রতিটি মানুষের জীবন ও আধ্যাত্মিকতার ভিন্ন ভিন্ন অর্থ প্রকাশ করে। স্থানীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, ১৯৬৬ সালে নবমী তিথিতে মা দুর্গা স্বপ্নযোগে ভক্তদের নির্দেশ দেন যে তাঁকে বিসর্জন দেওয়া যাবে না। সেই থেকে বরকামতায় বিসর্জন প্রথা বন্ধ হয়ে যায় এবং শুরু হয় প্রহরব্যাপী নামযজ্ঞবরকামতা দুর্গাবাড়ির সাধারণ সম্পাদক বীর মুক্তিযোদ্ধা নারায়ণ চন্দ্র দেবনাথের ভাষায়—“মা দুর্গার নিকট আমাদের প্রার্থনা হোক, তিনি যেন অশুভ শক্তির অবসান ঘটিয়ে সত্য, সুন্দর ও ন্যায়ের আলোকে বিশ্বভ্রাতৃত্ব গড়ে তুলতে সাহায্য করেন।”
অতএব, বরকামতা দুর্গাবাড়ি শুধু ধর্মীয় পূজার স্থান নয়, এটি বাংলাদেশের আধ্যাত্মিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসের এক অনন্য নিদর্শন। ১৩০০ বছরের এই পূজা আমাদের ঐতিহ্য, বিশ্বাস ও সামাজিক সংহতির জীবন্ত সাক্ষ্য হয়ে আজও টিকে আছে।


কোন মন্তব্য নেই